আবদুল জব্বার

জন্ম: ১০ই অক্টোবর, ১৯১৯

মৃত্যু: ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২

জন্মস্থান: ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও থানার পাঁচুয়া গ্রাম

১৯৫২ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি আবদুল জব্বার নামের ৩৩ বছরের এক যুবক ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি থাকা শ্বাশুড়ির ক্যান্সারের চিকিৎসা বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে। আবদুল জব্বার খুব বেশি দূর পড়াশোনা না করলেও দেশে-বিদেশে ঘোরার কারণে একটু-আধটু ইংরেজি বুঝতেন, অফিস-আদালতে কাজ ধরতে পারতেন। তাই শ্বাশুড়ির চিকিৎসায় তাঁর স্ত্রীর বড় ভাই তাঁর সহযোগিতা চেয়েছিলেন। হাসপাতালে আবদুল জব্বার খুঁজে পেলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক সিরাজুল ইসলামকে, যার সাথে তাঁর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই পরিচয়। পরদিন, ২১শে ফেব্রুয়ারি বিকেল পর্যন্ত শ্বাশুড়ির চিকিৎসার বিষয়ে আবদুল জব্বার চিকিৎসকের সাথে কথা বললেন। অন্যদিকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে প্রতিবাদমুখর ছাত্ররা সকাল থেকেই ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে বের হয়ে এসেছিলেন। বিকালে ছাত্রদের একটি অংশ মেডিকেল কলেজের সামনে চলে এলে আবদুল জব্বার ছাত্রদের মিছিলে যোগ দেন। পুলিশ বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার উপর টিয়ার গ্যাস, গুলি ছোঁড়ে। হঠাৎ আবদুল জব্বারের ডান হাঁটুতে গুলি লাগে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনি খুড়িয়ে খুড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পর মুহূর্তেই আরেকটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় তাঁর কোমরে। ছাত্ররা তাঁকে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে ভর্তি করান। হাঁটুতে অস্ত্রোপচার করে গুলি বের করা সম্ভব হলেও কোমরের আঘাত সামাল দেয়া যাচ্ছিল না। এমন অবস্থাতেও আবদুল জব্বার জ্ঞান হারালেন না। নিজের মুখে বলে গেলেন স্ত্রী-পুত্রের কথা। রাত আটটার পরে নিভে গেল আবদুল জব্বারের জীবন প্রদীপ। কিন্তু সেই জীবন প্রদীপ নিঃশেষিত হওয়ার আগে আগুন জ্বালিয়ে গেল শত শত প্রাণে।

ভাষা শহীদ আবদুল জব্বারের জন্ম ময়মনসিংহের গফরগাঁও থানার পাঁচুয়া গ্রামে, বাংলা ১৩২৬ সনের ২৬শে আশ্বিন, ১০ই অক্টোবর, ১৯১৯ সালে। হাছেন আলী শেখ এবং সাফাতুন নেছার প্রথম সন্তান তিনি। তাঁর পূর্ব পুরুষগণ ছিলেন ময়মনসিংহের গ্রামের সাধারণ কৃষক। আবদুল জব্বার তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় তাঁর বাবা বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অভাবের সংসার কীভাবে চলবে সে দুশ্চিন্তা ছেলেবেলা থেকেই তাঁর মাথায় চেপে বসে। ফলে পড়াশোনা ঠিকমত হয়ে ওঠে নি। চৌদ্দ-পনের বছর বয়সে কিশোর আবদুল জব্বার ঢাকাগামী ট্রেনে চেপে বসেন। সেই ট্রেনে এসে পৌঁছান নারায়ণগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জের নৌ-বন্দরে তখন বড় বড় বাণিজ্য জাহাজ এসে ভিড়তো। তেমনি জাহাজের এক ইংরেজ মালিক তাঁকে নিজ জাহাজে তুলে নেন। সেই ইংরেজ জাহাজ মালিকের সাথে আবদুল জব্বার সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তৎকালীন বার্মার রেঙ্গুনে গিয়ে পৌঁছান। ইংরেজ সাহেবের সাথে তিনি থাকতে লাগলেন, কাজ করতে শুরু করলেন। এ সময় জাহাজে করে বিভিন্ন দেশে যাওয়ার এবং বিভিন্ন ভাষার মানুষের সাথে মেলামেশা করার সুযোগ ঘটে তাঁর।

এভাবে কয়েক বছর কেটে গেলো। আবদুল জব্বার দেশের টান, ঘরের টান অনুভব করতে লাগলেন তীব্রভাবে। কিশোর বয়সে ঘর ছাড়া আবদুল জব্বার শেষ পর্যন্ত ঘরে ফিরে এলেন ১৯৩৮ সালের জুন মাসে। তখন তিনি টগবগে যুবক। তবে এবারও খুব বেশি দিন থিতু হলেন না ঘরে। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বৃটিশ নৌবাহিনীতে নাম লেখালেন তিনি। কিন্তু সেখানে প্রশিক্ষণের সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৯৪১ সালে নৌবাহিনী ত্যাগ করে গ্রামে চলে আসেন তিনি। যুদ্ধের এ পরিস্থিতির মধ্যে আবদুল জব্বারের বাবা মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে তিনি সেনাবাহিনী থেকে ফেরত তাঁর কয়েকজন বন্ধু ও গ্রামের ছেলেদের নিয়ে গ্রামে নাটক, গান, খেলাধুলা, ইত্যাদির আয়োজন করতে লাগলেন। সে সময় গফরগাঁওয়ে বৃটিশ বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। ১৯৪৭ সালে তিনি ময়মনসিংহে পাকিস্তান ন্যাশনাল গার্ডে (পিএনজি) যোগদান করেন। কিছু দিন পর পিএনজি থেকে তাঁর স্থানান্তর হয় আনসার বাহিনীতে। আনসারের মৌসুমী প্রশিক্ষণের জন্য তাঁকে বছরে দুইবার কয়েক সপ্তাহের জন্য ময়মনসিংহ শহরে যেতে হতো এবং গ্রামে এসে আনসার প্রশিক্ষণ দিতে হতো। এছাড়া স্থানীয় লক্ষীর বাজারে তাঁর একটি ছোট মুদি দোকান ছিল। সারাদিন দোকান চালিয়ে রাতে টেন্ডু পাতা আর তামাক নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরতেন। টেন্ডু পাতার মধ্যে তামাক ভরে বিড়ি তৈরি করতেন তিনি ও তাঁর স্ত্রী আমেনা খাতুন, যেগুলো পরদিন সকালে দোকানে বিক্রি করা হতো। এমন অভাব অনটনের মধ্যে ১৯৫০ সালে ঘরে আনন্দের উৎস হয়ে জন্ম নেয় তাদের একমাত্র সন্তান নুরুল ইসলাম বাদল। অভাবের কারণে ছেলের খাবারের ব্যবস্থা সব সময় ঠিকমতো করা সম্ভব হয়ে উঠত না। আবদুল জব্বার প্রশিক্ষণে গেলে তাঁর স্ত্রী প্রতিবেশীর কাছ থেকে চাল ধার করে এনে ছেলের খাবারের ব্যবস্থা করতেন।

১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নিয়ে ময়মনসিংহে রাজনৈতিক তৎপরতা চলায় আবদুল জব্বার আন্দোলনের পরিস্থিতি নিয়ে অবগত ছিলেন। ২০শে ফেব্রুয়ারি আবদুল জব্বার শ্বাশুড়ির চিকিৎসার খোঁজ-খবর নিতে ঢাকা আসতে চাইলে তাঁর ছোটো ভাই তাঁকে আন্দোলনের এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে ঢাকায় না আসতে পরামর্শ দেন। উত্তরে আবদুল জব্বার বলেন,

“যত চেষ্টাই করা হোক পশ্চিমারা আমাদের কথা বলা কিছুতেই বন্ধ করতে পারবে না। আমরা যদি এই সমস্ত আন্দোলনের খোঁজ-খবর না রাখি, তা হলে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে খবর পৌঁছাবে কে? আর আমি দেশ বিদেশ ঘুরা মানুষ, আমাদের কাছে সাধারণ মানুষ কোনো সংবাদ জানতে চায় আমরা তাদেরকে কি জবাব দিব?” (ভাষা শহীদ আবদুল জব্বার, উলফত রানা ও নুরুল ইসলাম বাদল)

সেদিন সকালের নাস্তা সেরে ছোটো ভাইয়ের সেন্ডেল জোড়া আর কলম নিয়ে, পাঞ্জাবির খুলে যাওয়া বোতাম সেলাই করে আবদুল জব্বার ঢাকাগামী সকাল দশটার ট্রেন ধরার জন্য গফরগাঁওয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তবে যাওয়ার আগে তিনি স্ত্রীর হাতে ছেলের খাবারের জন্য আট আনা পয়সা দেন। আর ছোট ভাইয়ের কোলে তাঁর এক বছর তিন মাস বয়সের ছেলে বাদলকে দিয়ে বললেন,“তুমি কাকার সাথে খেলা কর, আমি ঘুরে আসি।”

সেই যাওয়াই শেষ যাওয়া হল আবদুল জব্বারের। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি, রক্তঝরা সেই দিনে বাংলা ভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সাধারণ মানুষের দাবি আদায়ের লড়াইয়ে শরিক হলেন, আত্মত্যাগ করলেন আবদুল জব্বার। সেই সাথে রফিকউদ্দিন আহমদ, আবদুস সালাম, আবুল বরকতের রক্তে রাঙা হল ঢাকার রাজপথ।

তথ্যসূত্র: ভাষা শহীদ আবদুল জব্বার (উলফত রানা ও নুরুল ইসলাম বাদল)
তথ্য সংগ্রহ ও উপস্থাপন: সৈয়দা আফিয়া মাসুমা। সদস্য, শিক্ষা সভা।